পরিবেশ হোক আগামীর চিন্তা – আগামীর সংস্কৃতি

Author
উজ্জ্বল কুমার মুখোপাধ্যায়

থিঙ্ক গ্লোব্যালি, বাট এ্যাক্ট লোক্যালি। আমার ঘরের পাশের নদী, আমার ঘরের পাশের জলাশয় রক্ষার আন্দোলন আজ পৃথিবীর সব থেকে বড় ও প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক আন্দোলন ও বটে।

Let the environment be the thought of the future – the culture of the future
দ্বিতীয় পর্ব



গুঞ্জনটা ক্রমাগত কোলাহলে রূপ পেতে চলেছে বুঝতে পেরে বেরিয়ে এলেন হিমু দি ঠাকুরদালানে। প্রথমে কিছু বোঝেননি। সম্বিত ফিরল যখন ফাটকের দিকে চোখ পড়ল। আসল গুঞ্জনটা ফাটকের ওপার থেকে। শ'দেড় থেকে পৌনে দু'শ সর্বাধিক ধরতে পারে এরকম ঠাকুরদালানে সভার জন্য ভর্তি হয়ে যাবার পর আরো ৭০-৮০ জন তখন ফাটকের বাইরে। আশুবাবুর প্রথম দিনের বক্তৃতার সৌরভ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই তা শোনার আগ্রহীকুল বাড়তে থাকে মহল্লায়। এর আগের দিনের তুলনায় আজকের লোকসমাগমের বৈশিষ্ট্য হ'লো কনিষ্ঠদের ভিড়। তিরিশের তলায় মহিলা পুরুষরা এসেছেন এবং বোঝাই যাচ্ছে এমন অনেকেই এসেছেন যারা নব্য  স্বামী-স্ত্রী। হিমু দি তৎক্ষণা বুঝলেন, আজকের এই আলোচনায় সকলর যোগদানের ব্যবস্থা করতেই হবে। জেন-জি-রাই তো তুলে ধরবে পরিবেশ আন্দোলনের পতাকা । তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্তে শতরঞ্চিতে বসে যে শ'দেড়েক মানুষ, তাদের সামনে পেতে রাখা চৌকির ধারে দাঁড়িয়ে করজোড়ে সকলকে অভিবাদন জানালেন আর অনুরোধ করলেন আজকের সভা সকলেই যাতে দাঁড়িয়ে শুনতে পারেন - তার জন্য। অবশ্যই এই অনুরোধের সাথে সাথে তার কারণটাও অত্যন্ত মার্জিত ভাবে ব্যাখ্যা করলেন হিমু দি এবং সে অনুরোধ সাথে সাথেই উপস্থিত সকলে মেনে নিলেন । মিনিট দশের মধ্যেই ঠাকুরদালান এমন শ’আড়াই মানুষের সমাবেশে পরিণত হলো যার প্রথম দিকে শতরঞ্চিতে বেশি বয়স্করা বসে এবং বাকিরা পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে।

এই সময়ে আশুবাবুর আবির্ভাব। তিনি এতক্ষণ বন্দি ছিলেন খুবই ছোটদের ভিড়ে বৈঠকখানা ঘরে। জনা ১৫-২০, যারা সবে কলেজে ঢুকেছে, পরিবেশ বিজ্ঞান, বিশ্ব উষ্ণায়ন, সুন্দরবনের আর হিমালয়ের বিভ্রাট, জলবায়ুর তঞ্চকতা ইত্যাদি নিয়ে যাদের মন উথাল পাথাল, তারা ঘিরে ধরে অলরেডি প্রায় মিনিট ৪৫ বকিয়ে নিয়েছে আশুবাবুকে। খুব ছোট দুই লাইনের মুখবন্ধ - আশুবাবু আগের দিন কি বলছিলেন সেই বিষয়ে। হিমু দি তারপরে শান্তভাবে চৌকিতে বসলেন। আশুবাবুর আজকের কথা বলাটা ছিল এতাবৎকালের অন্য সব ধরনের ওঁর আলোচনা থেকে আলাদা এবং নিম্নরূপ। 

দেখুন অত্যন্ত উৎসাহ ভরে আপনারা সকলে এসেছেন গতদিনের আমাদের আলোচনার সুর বরাবর আরো বড় প্রেক্ষাপটটা সম্পর্কে কিছু ধারণা আহরণের জন্য। কিন্তু আমি মানুষটা এটুকু সময়ের মধ্যে ভেঙেচুরে জেরবার হয়ে গেছি। আমি কি করে ভাবতে পারি, পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের আমি যে একজন অধিবাসী, সেটা বুঝে উঠতে পারছি না? আমি প্রায় মার খেলাম সেদিন জানেন, মানে ধাক্কাধাক্কি তো বটেই। কারণ আমি বাসে উঠেছিলাম আর উঠে আমি জানতে চেয়েছিলাম বাস কন্ডাক্টার যে ভাড়া চাইছে সে ভাড়াটা কে ঠিক করে দিল । মোটামুটি একই দূরত্বে হাওড়া কলকাতায় তিন-চারটি রুটে যদি আপনি বাসে চড়েন, দেখবেন কোথাও ১২  কোথাও ১৫ কোথাও বা ১৬ টাকা তারা ভাড়া চায় সবচেয়ে কম দুরত্বের জন্য। এ ভাড়া কি করে ঠিক হলো এ প্রশ্নের কোন জবাব নেই। জবাব চেয়েছিলাম বাসে উঠে। চেয়েছিলাম আরটিও অফিসারের সই করা ভাড়ার চার্ট। ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া, আরো ৫-৭ জন "কি হয়েছে দাদা" বলে ঘিরে ধরে ধাক্কাধাক্কি আর আরো লাঞ্ছনা । অথচ আমি যেখানে থাকি সেই অঞ্চলে অনেক বেসরকারি বাস শ্রমিকদের বাস এবং তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক, বিশেষত তাদের রুজি এবং সার্ভিস কন্ডিশনের আন্দোলন নিয়ে নড়াচড়া ও সাথে থাকা আমার অন্তত ৪০ বছরের। মনে পড়ল বছর তেরো আগের কথা যখন মুখ্যমন্ত্রী বাস মালিকদের সাথে ভাড়া বৃদ্ধি বিষয়ে আলোচনায় বসেছেন এবং এক অনড় মনোভাব নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন সরকার বাস ভাড়া বৃদ্ধির পক্ষে নয়। কিন্তু সে আলোচনা কোথায় হারিয়ে গেল? কোথায় হারিয়ে গেল আমার এ বৃহত্তম গণতন্ত্রের বলিষ্ঠ সরকারের নিয়ম বাঁধা বাস পরিষেবা? করোনার সময় রাস্তাঘাট ভোঁ ভাঁ। তারপর ধীরে ধীরে আমরা বুঝতে থাকলাম ব্যবস্থা স্বাভাবিক হচ্ছে। আমরা সকলে মেনে নিয়েছি এখন ব্যবস্থা স্বাভাবিক কিন্তু এক অস্বাভাবিক অ্যারেঞ্জমেন্ট এই স্বাভাবিক অবস্থার পিছনে আমাদের অন্য এক মার্গে পৌঁছে দিয়েছে। সরকারের ব্যবস্থাপনায় বাস মালিকরা তাদের ইচ্ছা মতো বাস ভাড়া ঠিক করার গেহরকানুনী ছাড়পত্র পেয়ে গেছে। আর বাস ভাড়া নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা, তার সাথে লেগে থাকা মানুষজন, কাজকর্ম ইত্যাদি ওই নিমেষ খানিক-এর মধ্যে আমাদের সমাজ থেকে উধাও। বুঝলাম রাষ্ট্র তার কথা বলেছে। রাষ্ট্র তার আচার-আচরণে বুঝিয়ে দিয়েছে “দ্যাট. দা মিনিমাইজেশন অফ গভর্নেন্স ইন দিস সেক্টর হ্যাজ বিন অ্যাচিভড”। মুহূর্তে বাস ভাড়া নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সরকারি ব্যবস্থাপনা উধাও। আপনারা কেউ মনে করবেন না কিন্তু যে আমি বাস ভাড়া দিতে চাই না বা আমি বাস ভাড়া বৃদ্ধির বিরোধী। আমি শুধু বলতে চাই সংবিধান এবং গণতন্ত্র তার প্রয়োগে মানুষ রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে যে আত্মিকতা নিয়ে বড় হচ্ছিল এতদিন তার একটা বিশেষ স্তম্ভ সে হারিয়ে ফেলেছে। এই ব্যবস্থাপনা বুঝিয়ে দিয়েছে যে তুমি যে দেশে বাস কর সেই দেশে এই বাস ভাড়া পরিষেবার দাম কি হবে সেটা ঠিক করবে বাস মালিক এবং তার সাথে সাথে শুধু টিকিটের দাম নয় কোন দিন বাস থাকবে কোন দিন থাকবে না এমনকি হঠাৎ বলবে আজ এখানেই শেষ এসব কিছুর একমাত্র নিয়ন্ত্রক বাস মালিক। আমার সংবিধান আমার সরকার মানে আমি এদেশের নাগরিক আমার প্রতি সরকারি ব্যবস্থাপনা সে যে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে নিয়ন্ত্রণ করবে এই পুরো বাস পরিষেবার বিষয়টি তা ব্যবহারিক ক্ষেত্র থেকে উধাও হয়ে গেল। শুধু এটুকুই কিন্তু না। তার সাথে সাথে আরও উধাও হলো এ দেশ এই গণতন্ত্র আমার মানুষের অধিকার ৭৮ বছরের স্বাধীনতার আস্বাদন এসব কিছুর মাত্রা । আমরা নিশ্চিতভাবে স্বীকার করে নিতে  বাধ্য হলাম আর বুঝতে শুরু করলাম যে ব্যবসার মালিক যে হবে, তার নির্দেশনা মানতে আমি বাধ্য। আমরা এই বাধ্যতার গন্ডির মধ্যেই বাস করছি এই বৃহত্তম গণতন্ত্রে ।

এই একই বিষয় আবার মূর্ততা পেল ট্যাক্সি ভাড়াতে । সবই আছে । মিটার আছে, তার রেজিস্ট্রেশন আছে, ট্যাক্সিতে তা লাগানোও আছে নিপাট। কিন্তু বাজি ধরে বলতে পারি যদি কেউ আজই আমায় এখনই এখান থেকে আমার ইচ্ছে মতো জায়গায় একটা ট্যাক্সিতে করে তার মিটার অনুযায়ী নিয়ে যেতে পারে। সরকার নির্দেশিত নিয়ম মেনে মিটার অনুযায়ী ট্যাক্সি ভ্রমণ এর ইতিহাস কলকাতা হাওড়া এই শহরাঞ্চলের চালচিত্র থেকে উধাও। সে জায়গায় বিরাজ করছে কি? না ট্যাক্সির ড্রাইভার যে ভাড়া চাইবে সেই ভাড়া দিতে আপনার বাধ্যতা । আমি এখানেও ঠেকে গেলাম। আমার এক বন্ধুর সঙ্গে গেলাম এখান থেকে সিঁথির মোড়। সেখানে উল্টোদিকে ধর্মতলা যাব বলে ট্যাক্সি ধরলাম। সে কিন্তু বাঁধা ভাড়ায় যেতে চায়। মানে সে যা ভাড়া চায় সেটাই দিতে হবে। মিটারের বাঁধা বাঁধিতে সে রাজি নয়। অতএব শুরু করলাম চেঁচামেচি । আরো ৫-৭ জন ড্রাইভার এবং অন্যান্য ধরনের মানুষজন চলে এলেন । তাদের সকলেরই বক্তব্য মিটারে আবার এখন ট্যাক্সি চলে নাকি? আমরাও ঠিক ছাড়ার পাত্র নই । কী হয়, তার হিসেবেই তো গেছি । কিছু বাদে পুলিশ ও এসে গেল একজন । পুলিশ মানে যে সে পুলিশ নয় । এ পুলিশ সেই পুলিশ যে ইচ্ছে হলে আপনাকে বাড়ির ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে মেরে ফেলতে পারে, এ পুলিশ সেই পুলিশ যে ইচ্ছে হলে অবনীলায় আপনাকে গাঁজা কেসের বন্দোবস্ত করে দিতে পারে, এ পুলিশ আপনি যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সেই ক্ষেত্রে চূড়ান্ততম প্রতিরক্ষার মধ্যেও আপনি মহিলা হলে আপনাকে ধর্ষণ এবং খুন করার লাইসেন্স প্রাপ্ত পুলিশ। । এবং হলও তাই। কথা শোনার অভ্যাস এঁর নেই বুঝলাম। কর্তব্যের তাগিদটাও ঘড়ির কাটার চেয়ে অনেক দ্রুতগতির। আর একবার সেই বাস ভাড়ার বিষয়ের মত যেটা হলাম আমরা তাকে এক কথায় বলা যায় “ম্যানহ্যান্ডল্ড”। যারা এখানে আছেন, শুনছেন আমার কথা, একবারও কিন্তু ভাববেন না যে আমার বক্তব্যের বিষয়বস্তু হলো আমার বা আমার বন্ধুর বিড়ম্বনা। আমার বিষয়বস্তু হলো এটাই যে সরকার বা গণতন্ত্রে বেশিরভাগ মানুষের ইচ্ছা আর চাহিদার প্রতিফলন এর যে রূপ, সেই রাষ্ট্র তার চরিত্র বদলাচ্ছে । সরকার তার কাজকর্মের পরিধি ক্রমাগত কমাচ্ছে, আর সেই পরিসর গ্রহণ করছে ব্যক্তি মানুষের মুনাফার অধিকার। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন সব সাধারণ মানুষ তাদের স্বাধীনতা প্রাপ্তির মধ্যে দিয়ে যে অধিকার কায়েম করেছিল বর্তমানে সরকারের চলাফেরা সেই অধিকার হরণ করছে আর তার সাথে সাথেই ঘটে যাচ্ছে আরেক জায়গার আমূল পরিবর্তন । সেটা আমার মস্তিষ্কে । আমার স্বাধীনতার ফল কি, সে সম্পর্কে জানা যে মানুষ, যে মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার, মর্যাদা এবং কর্তব্য সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে নতুন ভারত গড়ে তোলার কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে চাই, তাদের প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে, যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তুমি যা তৈরি করেছ, সেই সরকার-এর প্রথম এবং প্রধান কাজ হল তোমার গণতান্ত্রিক অধিকারকে অবলুপ্তির পথে পাঠিয়ে ব্যক্তি মালিকের মুনাফার অধিকার কে প্রতিষ্ঠা করা।
 
এবার দেখুন এই একই রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমরা আরও দেখতে পাচ্ছি আমাদের চোখ যত খুলছে আমাদের বৌদ্ধিক মনন তত ছোট একটা সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যেতে চলেছে। এ ব্যবস্থা ক্রমাগত আমাদের বুঝতে বাধ্য করছে যে তোমরা এতদিন অর্থাৎ স্বাধীনতার বিগত ৭৮ বছর ধরে স্বাধীনতার ফল বলে তোমার প্রাপ্তির ভান্ডারে যা যা লিখেছিলে বা বুঝেছিলে সেগুলো মুছে ফেলো, ভুলে যাও। তুমি যদি জেনে থাকো যে এক স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে শিক্ষা পাওয়া তোমার অধিকার আর রাষ্ট্র বা সরকারের কর্তব্য হলো তোমাকে শিক্ষিত করা, তাহলে আজকের দিন হবে তোমার সেটা ভোলার শুরুর দিন। তুমি যদি এটা মনে করে থাকো যে ভালো করে পড়াশোনা করে ভালো পরীক্ষা দিয়ে তুমি ভালো কাজ পেতে পারো তাহলে আজকে তোমার সে অভিজ্ঞতা ভোলার দিন। এমনকি তুমি যদি মনে করে থাকো যে গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ আদালতের কাছে গিয়ে তুমি রাষ্ট্রের প্রবঞ্চনা হেতু তোমার অধিকার প্রাপ্তির কথা জানাবে, চাইবে প্রতিকার, তাহলে রাষ্ট্রের প্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে তোমার এই প্রতিকার চাইবার চাহিদার একাগ্রতার জন্যই আদালতের চোখ কান বন্ধ করে দিতে পারার চাবিকাঠিও ওই সরকার ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনাধীন ; এটাই ৭৮ বছরের আপনার স্বাধীনতার আস্বাদন। পরিবেশ নিয়ে কথা বলব? পরিবেশের আন্দোলন করব? আরে আরো বৃহত্তর ন্যায়, মানুষের Fundamental Rights, তাই যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, কিসের পরিবেশ আন্দালন হে? আমাদের দেশের ২০০৬-এর পরিবেশ নীতি আমাদের বড় গর্বের বিষয়। কত আহ্লাদ করেই না আমরা সেখানে লিখেছিলাম:  

The present day consensus reflects three foundational aspirations:
First, that human beings should be able to enjoy a decent quality of life; 
second, that humanity should become capable of respecting the finiteness of the biosphere;
and third, that neither the aspiration for the good life, nor the recognition of biophysical limits should preclude the search for greater justice in the world.

এখন আমার এ পৃথিবীতে এই Greater Justice বা বৃহত্তর ন্যায়-এর জন্য আন্দালন-ই সকলের সবচেয়ে আশু কর্তব্য।

জল খাবার জন্য থামলেন আশু বাবু। শ্রুতিমন্ডলীতে অল্প বিস্তর নড়াচড়া। কয়েকজন একটু বাইরে গেলেন। যারা বসেছিলেন হাত তুলে তাদের মধ্যে আমাদের সকলের প্রিয় সমর দা মানে এখনো আমাদের এই অঞ্চলের একমাত্র লেটার প্রেস যিনি চালান সেই সমরদা একটা কিছু কথা বলতে চাইলেন। হিমু দির সম্মতিতে তিনি বললেন আশু বাবুকে উদ্দেশ্য করে। তিনি বললেন, “এসব তো রাজনীতির কথা বলছেন মশাই। এর সাথে আজকের দিনের অস্বাভাবিক পরিবেশ এবং সেইজনিত ব্যবস্থা থেকে মুক্তির নিদর্শন তো কিছু আপনার কাছে শুনলাম না”! 

আশু বাবু এবার বোধহয় বোধ করলেন আসল কথায় ফেরার দরকার। তিনি বলতে থাকলেন,  দেখুন আমরা আলোচনা শুরু করেছি পরিবেশ বিষয়ে এটা ঠিক কিন্তু আলোচনা তো করছি আমরা মানুষের পরিবেশ নিয়ে। মানুষ আছে একটা নির্দিষ্ট পরিবেশে তবেই তো এই আলোচনা। মানুষ যদি নাই থাকতো? কদিনই বা মানুষ আছে বলুন এ পৃথিবীতে? হাজার ৩০ বছর। আর এ ব্রহ্মাণ্ডের বয়স হোক না হাজার ষাট-পঁয়ষট্টি কোটি বছর। মানুষ তো বেশ পেয়ে বসেছে এ পৃথিবীটাকে। তার সমস্ত কিছু রসদ আর ভান্ডার সবকিছুকে নিজের আপন করে নিয়েছে। আর তারপর কি জানেন, মানুষ সেজন্যই মানুষ - যে কিনা প্রাকৃতিক উপাদানকে পাল্টে নিতে পারে নিজের সুবিধার্থে, আর একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে, ক্রমাগত উন্নয়নের গতি মুখে। আর এটাই সবকিছুর শুরু। সভ্যতার এক অনন্ত যাত্রা। এই বস্তুর রূপান্তরে বস্তু পরিণত হয় পণ্যে. যখন তার উপরে মানুষের অধিকার একটা ডিফারেন্সিয়াল কে সূচনা করে। মানে হলো এ রূপান্তর যেই করাক না কেন, অল্প কিছু মানুষ সেই রূপান্তরিত বস্তুর মালিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে. আর অনেক মানুষকে তার ব্যবহার করতে দেয় একটি নির্দিষ্ট বিনিময়ের মাধ্যমে। আর তাতেই তৈরি হয় প্রফিট বা লাভ আর এই প্রফিট আর তার পিছনের মনন হ’ল যত নষ্টের গোড়া। এই প্রফিটের পিছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ তার তিরিশ হাজার বছরের “অগ্রগতি”র ইতিহাস তৈরি করেছে। আর তৈরি করেছে মাত্রাতিরিক্ত ক্লেদ আর বর্জ্য। আসলে সবটাই সহনশীল মাত্রা আর তাকে টপকে পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অভিঘাত। আপনারা যে পরিবেশ বিষয়ে আলোচনা শুনতে  এসেছেন তারও গোড়ার কথা এটাই। পৃথিবীপৃষ্ঠে পৃথিবীর অবদানকে মানুষ তার নিজের লিভিং কন্ডিশনের উন্নয়নে পরিবর্তিত করে নিতে গিয়ে যে দ্রুতির জন্ম দিয়েছে, সেই দ্রুতি সহ্য করে নেবার শক্তি বা ক্ষমতা এ পৃথিবীর আছে কি নেই সে প্রশ্নের অবতারণা নিরপেক্ষভাবেই । আর এই গতি জন্ম দিয়েছে একটা “মুনাফা” নামক  রাক্ষস। আর তাকে বাঁধতে চাওয়া এবং পারাটা হচ্ছে পরিবেশকে সুস্থ করার আন্দোলন। আজকের পৃথিবী এত দেশ ঘুরে এত আলোচনা করে, যে জায়গায় এসে থামতে চাইছে, সেটা আমরা প্রতিটি মানুষ আমরা প্রত্যেকে আমার নিজের দিকে যদি তাকাই আমার নিজের চাহিদা আমার সমাজের চাহিদা, আমার উন্নয়নের চাহিদার পরিমাণ এবং গতিবেগ যা কিনা এই মাদার-নেচার  তার নিজস্ব গতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ মনে করবে, তবেই এই আন্দোলন জিতবে। তাতে একে রাজনীতি বলেন তো মাথা পেতে নিই আর বলি, আসুন আমরা রাজনীতিটাই করি। 

সুখেন্দু বিশ্বাস জাহাজী। প্রমোদ-তরণীর ডাক্তার। আজীবন বড় কর্পোরেট জাহাজে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছে। বাংলাটাও বলেন ইংরেজিতে, আর অল্প উত্তেজনায় অনর্গল ইংরেজি তার বেরোবেই বেরোবে। হাত তুলে বলতে শুরু করলেন, “Absolutely unacceptable for me is your proposition. The last thing I can, is to join politics. Now tell me sir, if at all their exists any correlation between our exposure to the environment extremities as is happening today with appropriation of natural resources as you continuously keep mentioning, I am with you notwithstanding. 

একটু উত্তেজিত লাগলো আশুবাবুকে। উনি সভাটা শেষ করতে চাইলেন এইভাবে।

We all know that the humans have fundamentally and unmistakably influenced the planet, but what does that influence look like? The most interesting parts of the response are where we  most physically alter the planet. Greenhouse gases caused by fossil fuel use come from combustion in automobiles, including sea and air traffic, and industrial processes and these gases are increasingly concentrating in our atmosphere causing heat to become trapped on earth and resulting in rising of global temperature. And that is the bloody reason that man has tremendously influenced the earth atmosphere by the motive of appropriation of profit, profit and profit out of commodity production. Now it's you to decide who is the cause of danger on earth. Not the human, not any other creature, not carbon dioxide, not the heat; it's the motive of man to appropriate the surplus to maximize the profit, profit and profit and that is my bloody point for today sir.


কিছুক্ষণ চুপ থেকে আস্তে আস্তে বললেন আশু বাবু, -
অবশ্য আমাদের-ও কিছু করণীয় আছে এই পরিবেশ বিষয়ে। নতুন কথা আর কী বলি বলুন ? নদীমাতৃক এই দেশে, প্রকৃতির সবথেকে বড় আশীর্বাদ-এর জায়গায়, এ বাংলায় আমাদের মায়েরা, নদীরা, আজ সবথেকে বেশি আক্রান্ত। আমার তো মনে হয় পরিবেশ বলুন. রাজনীতি বলুন, বেঁচে থাকার চূড়ান্ত সংগ্রাম - যাই বলুন না কেন, “নদীকে রক্ষা করো; ওকে ফিরিয়ে দাও ওর গতিপথ” হওয়া উচিত আমাদের এখন সবথেকে প্রয়োজনীয় স্লোগান আর কর্মকাণ্ড। জানেন তো, সারা পৃথিবীর পরিবেশবিদরা একটা কথা বলেন। থিঙ্ক গ্লোব্যালি, বাট এ্যাক্ট লোক্যালি। আমার ঘরের পাশের নদী, আমার ঘরের পাশের জলাশয় রক্ষার আন্দোলন আজ পৃথিবীর সব থেকে বড় ও প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক আন্দোলন ও বটে। অবশ্য এ কথা আমাদের স্বপ্নের রূপকাররা অনেক আগেই বলে গেছেন তাদের বিশ্বদর্শনের নির্যাস হিসেবে। আসুন, সেই ওঁর-ই স্মরণাপন্ন হই –

বহুদিন ধরে'     বহু ক্রোশ দূরে 
বহু ব্যয় করি    বহু দেশ ঘুরে 
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা 
         দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু ।
দেখা হয় নাই    চক্ষু মেলিয়া 
ঘর হতে শুধু    দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শীষের উপরে 
         একটি শিশির বিন্দু ।


সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি দুটি পর্বে প্রকাশিত।
প্রথম পর্ব



*লেখাটির অংশবিশেষ পূর্বে পঞ্চায়েত দর্পণ পত্রিকায় প্রকাশিত

প্রকাশ: ১৩-অক্টোবর-২০২৫

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 17-Oct-25 12:40 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/let-the-environment-be-the-thought-of-the-future-–-the-culture-of-the-future - exists in postID 31971
Categories: Fact & Figures
Tags: environment, environmentalcrisis, northbengal, northbengal flooding
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড